বাংলাদেশে কফি প্রতিনিয়ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে পণ্যটির বাজারও বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন বড় শিল্প গ্রুপ। বিদেশ থেকে আমদানির পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ দেশে কফি চাষে যুক্ত হচ্ছে। দেশে কফি উৎপাদন, বাজার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির ডিরেক্টর (লিগ্যাল) করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, আরএসএ ও কোম্পানি সেক্রেটারি দেবব্রত রায় চৌধুরী
দেশে কফির বাজারের আকার কেমন? স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কফির হিস্যা কতটুকু?
বাংলাদেশে কফির বাজার গত বছর প্রায় ২৫ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যমান ছিল। আশা করি ২০২৯ সালের মধ্যে এটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ হবে। সে হিসেবে আগামী চার বছরে দেশে কফির বাজার প্রায় ৪৮ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বর্তমানে দেশের কফি উৎপাদন প্রায় ২৫ টন, যা মোট চাহিদার ৫ শতাংশের কম।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কফি চাষ কতটা উপযোগী? এখানে বড় পরিসরে কফি উৎপাদনের সুযোগ কতটুকু?
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল (বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি) কফি চাষের জন্য অনুকূল। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ ও চার থেকে পাঁচ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গের নওগাঁ জেলায় পরীক্ষামূলক কফি চাষে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে, যা বড় পরিসরে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখায়।
আপনাদের ব্র্যান্ড স্থানীয়ভাবে কফি উৎপাদন করে? স্থানীয় ভ্যালু এডিশন কতটুকু?
বাংলাদেশে আমরা বর্তমানে কফির উৎপাদন স্থানীয়ভাবে করি না। আমাদের কফি মূলত আমদানি করা হয়। তবে স্থানীয় ভ্যালু এডিশনের জায়গাটা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। উদাহরণস্বরূপ আমাদের বেশকিছু প্রডাক্ট যেমন নেসক্যাফে থ্রি ইন ওয়ান, লাটে, আইসড ফ্রাপে ইত্যাদি পণ্য বাংলাদেশেই প্যাকেজিং এবং কনফিগারেশনের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়, যাতে স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং সরবরাহ চেইনে অবদান রাখা যায়। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে আরো বেশি স্থানীয় সম্পৃক্ততা বাড়ানো। যেমন স্থানীয় রোস্টিং, ফ্লেভার ডেভেলপমেন্ট এবং সম্ভব হলে কৃষিভিত্তিক ইনিশিয়েটিভে অংশগ্রহণ। আমরা চাই কফি শুধু একটি আমদানি পণ্য না হয়ে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সুযোগের প্লাটফর্ম হয়ে উঠুক।
বাংলাদেশের চা-কেন্দ্রিক ঐতিহ্যের বিপরীতে কফিকে কীভাবে জায়গা করে দিচ্ছেন? দিন দিন পণ্যটির জনপ্রিয়তা বাড়ার বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে চা-নির্ভর হলেও কফির প্রতি আগ্রহ বিগত কয়েক বছরে প্রায় ৫৬% বার্ষিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, কর্মজীবী শ্রেণী এবং শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে কফির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ক্যাফে সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এ জনপ্রিয়তাকে ত্বরান্বিত করছে।
কফি চাষ ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা নীতিগত প্রতিবন্ধকতা কি রয়েছে?
বাংলাদেশে এখনো স্থানীয়ভাবে কফি উৎপাদন খুব একটা জনপ্রিয় নয়। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বনায়ন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। যেটি কফি উৎপাদনে প্রতিকূলতা তৈরি করছে। অন্যদিকে কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ এবং এ খাত সম্পর্কে ধারণা নেই। এছাড়া উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও চাপে পড়তে হয় কোম্পানিগুলোকে। বিশেষ করে ইনস্ট্যান্ট ও রোস্টেড কফিতে এ সমস্যাটি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নীতিনির্ধারক এবং এ খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয়ভাবে কফি চাষ ও ভ্যালু এডিশন করে যেসব কোম্পানি তারা সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করা কফির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কতটা সক্ষম?
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে স্থানীয় কোম্পানির বিশেষত্ব, গুণগত মান এবং ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নর্থ ইন্ড কফি রোস্টার বা এএমএ কফি স্থানীয় বাজারে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড হিসেবে কিছুটা বাজার ধরতে পেরেছে। তবে দাম ও সরবরাহ সক্ষমতার দিক থেকে এখনো আমদানীকৃত কফির প্রভাব বেশি।
আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের কফি ইন্ডাস্ট্রিতে আপনার প্রতিষ্ঠান কী কী নতুন উদ্যোগ নিতে চায়?
উদ্ভাবনী উদ্যোগ হতে পারে: স্থানীয় চাষীদের সঙ্গে কন্ট্র্যাক্ট ফার্মিং, বিশেষত্বসম্পন্ন কফি রফতানির প্রস্তুতি, রেডি টু ড্রিংক (আরটিডি) কফি পণ্য চালু, অনলাইন সাবস্ক্রিপশন সার্ভিস চালু, ক্যাফে এক্সপানশন দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরে এ উদ্যোগগুলো কোম্পানিকে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে।
বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের কফির বাজার কতটুকু বেড়েছে? আগামী ৫ বছরে এ খাতের সম্ভাবনা কতটুকু?
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের কফি বাজার প্রায় ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাজার কমপক্ষে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে শহুরে জীবনধারা ও ব্যস্ততা, তরুণ প্রজন্মের রুচি পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর খুচরা বিক্রি ইত্যাদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে যদি সরকার নীতিসহায়তা দেয় সেটিও একটি কারণ হবে।